আসছে বছর আবার হবে September 14, 2009 at 1:34 am

ব্যাপারটা সোশিও-সাইকো-ইকনমিও-মেডিশিও-হিস্টোরিশিও ভাবে প্রোফান্ড পেইন কিলার, বুকের বিষের থলিটা যখন বাড়তে বাড়তে ডবল এক্স এল এর সাইজ নেয়, সারা বাংলাদেশ জুড়ে একগাদা ভূমিহীন কৃষক, আয়লা পিড়ীত মানুষ, মাওবাদী হানা, খাদ্য আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি অথবা রাজ্য রাজনীতিতে রেল্মন্ত্রীর শকট যানে চড়ে মহাকরন প্রবেশের প্রবীন লালায়িত স্বপ্নের নাভিশ্বাস ওঠে তখন সমাজ পৌরানিক কল্কি অবতারের ভূমিকায় (প্রসঙ্গত নীতিশ ভরদ্বাজ অভিনয় থেকে অবসর নিয়েছেন বহুদিন)সেলফ ডিফেন্স মেকানিজমে দূর্গাপূজোর প্রত্যাবর্তন করে।আমরা অর্থাৎ বং-রা(নামকরনটি অঞ্জন দত্তের আমাকে দোষারোপ করবেন না; প্রসঙ্গত সং বলার সৎ-সাহস নেই তাই ইনলাইন অক্ষরেই বললাম) এখন ভেবে বসেছি জল পড়া, পাতা নড়া, বৃষ্টি পড়া, সূর্য ওঠা ও পাশের বাড়ির ন্যাপার এবারও অঙ্কে ফেল করার মতোই এটাও এক নিয়মানুবর্তিক পর্যায়বৃত্ত প্রাকৃতিক সত্য। কিন্তু মুশকিল হল যে এই গরল ইসাবগুলের গুলি খেয়ে কোঁত পেড়ে বের না করে দিতে পারলে বিষাক্ত জ্বলুনীতে গা ফুটিফাটা এবং দাগড়া দাগড়া বিরক্তির জ্বরুলে আমাদের এই লাহ্যময়ী বঙ্গললনা হয়ে উঠবে শঙ্কিনী। তাই শতাব্দী প্রাচীনকাল থেকে আমাদের পূর্বপুরুষ সমাজবন্ধুরা অটো সাজেশান অথবা সেলফ হিপন্যোটিজমের মতো কষ্টলাঘবকারী দমদম দাওয়াই আবিষ্কার করেন; যা সেবনের নিয়মাবলী প্রেচক্রিপশন থুড়ি পজ্ঞিকা নামে সুবিখ্যাত।

এতদূর পড়েই যারা মনে মনে সুর ধরেছেন “চলো পাল্টাই-আমরা নতুন বাঙালী” সেসব পোষ্ট মডার্ন স্বাধীনচেতা পরিবর্তনবাদী (পরিবর্ত্নকারী আদৌ নয়) দোর্দন্ডপ্রতাপ আধুনিক বঙ্গ তরুন তরুণিদের বলবো সংযম (শব্দটার ভাবার্থ জানা না থাকলে অভিধান দেখতে পারেন তাতেও বোধগম্য না হলে রাজশেখর বসুকে প্ল্যানচেটে ডাকতে পারেন) রক্ষা করতে। আসলে কি জানেন কোনও ভালোবাসা, কোনও ধর্ম, কোনও গুরুবানী কোনও মহৎ উদ্দেশ্য মানুষকে এতটা সঙ্গবদ্ধ করতে পারে না, যতটা পারে ঘেন্না।ধরুন প্রেমিকা প্রিয়ংবদার সাথে প্রেমালাপ সেরে বুদ্ধির গোঁড়ায় সিগারেটের ধোঁয়া ছুঁড়ে পটলের কাকার অকষ্মাৎ মৃত্যুর শোকসভায় অংশগ্রহন করার আগে রুমাল দিয়ে যেমন আপনার শেষ হাসিটুকু মুছে ফেলতে হয় এবং প্রমান করতে হয় দখিন বাতাস যতই সুড়সুড়ি দিক আপনাকে, আপনি আসলে রামগড়ুরের আদর্শ বংশধর।তেমনই দূর্গাপূজোতে এর সম্পূর্ন বিপরীত বাধ্যতা, আপনি যতই বিষাদগ্রস্ত হন আপনাকে হাসিমুখে অপরের হাস্যবান বিনা দ্বিধায় মেনে নিতে হবে এবং সর্বদা কোলগেটের চলতি-ফিরতি ইস্তেহার সেজে থাকতে হবে।আপনাকে অহেতুক সাজুগুজু করে গায়ে সুগন্ধী ছিটিয়ে এবং সর্বোপরি নতুন জুতোর ফোসকার অসহ্য যন্ত্রনা সহ্য করেও মাইলের পর মাইল জনারন্য ঠেলে বীভৎস-বীভৎস বিভিন্ন প্রজাতির দূর্গা পরিদর্শন করতে হবে এবং দিনশেষে কোনও রেঁস্তোরায় বিটকেল স্বাদের আহার সেরে সদানন্দ হাসিটি নিয়েই বাড়ি ফিরতে হবে পাছে আপনাকে কেউ হুঁকোমুখো হ্যাঁংলা বলে এই ভয়ে।এর থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে বন্দুক হাতে দেশাত্মবোধের মুখোশের আড়ালে একবুক শাণিত লকলকে ঘেন্না নিয়ে বিপক্ষকে লক্ষ কোটি গালাগাল দিয়ে প্রচুর নাম না জানা আমারই মতো বিপক্ষের ঘৃন্য পশুগুলোকে বুলেট বিদ্ধ করে শেষে নিজেও সেই গুলি বৃষ্টিতে নিহত হওয়া অনেক অনেক বেশি শ্রেয় ছিল। অন্তত কিছু একটা করা যাতে মনের একগাদা থকথকে বিষাক্ত গরল ঘেন্নাটা একেবারে নিষ্কাশন করা যেত আর মৃত্যু নেশায়—প্রানটা জুড়াত।

মনে পড়ে সেইসব দিনের পূজোর দিনগুলোর কথা যখন বুদ্ধির প্রাচুর্যে মননের নির্মল অনুভূতি গুলো আত্মহত্যা করে নি। পূজো বলতে তখন ছিল মন কেমন করা স্ফটিকস্বচ্ছ শরৎ এর নীল আকাশ অথবা কোনওদিন না বলতে পারা অথচ মনে মনে নির্ধারিত প্রেমিকার পাড়ার পুজামন্ডপের একশো ছত্রিশ পাক আর একবার সলজ্জ দৃষ্টি বিনিময়ের নিদারুন তৃপ্তি। ছিল একগাদা বন্ধু মিলে সময়ের ঘড়িকে উপেক্ষা করে নিয়মের সংবিধানকে বুড়ো আঙুল দেখানোর দিন।ছিল বড় হওয়ার আকাঙ্খায় একটি সিগেরেটকে ভাগ করে সুখানুভূতি নেওয়ার দিন। আবার বাড়ির ভয়ে তটস্থ কিশোরের দল একগুচ্ছ মুখসুদ্দির আয়োজন করতো পাছে গন্ধ বিচারে ধরা না পড়তে হয়।ছিল শহরের অলিগলি চষে নতুন রাস্তা আবিষ্কারের নেশা অনেকটা নতুন দেশ আবিষ্কারের মতো। ছিল কাশফুলের মাঠে পবিত্র বাৎসল্যের লুকোচুরি খেলবার দিন।ছিল নিষিদ্ধ গানগুলো প্রকাশ্যে শোনবার আনন্দ। এখনকার প্রতিটি পূজামন্ডপ তো সংস্কৃতির একনিষ্ট আখড়া, সেখানে দরাজ গলায় সুচিত্রা বা মানবেন্দ্রর রবিগান ছাড়া শোনা যায় না। জানি সংস্কৃতি পরায়ন বাবুরা এই কথায় বিদ্রোহ ঘোষণা করতে চলেছেন। কিন্তু প্রাসঙ্গিকতাও তো একটা উল্লেখযোগ্য অঙ্গ নাকি? ভাবুন আপনার বিয়েতে যদি বিশমিল্লা খান সাহেবের সানায়ের বদলে পাড়ার দাদা্রা সংস্কৃতির নাম নিয়ে যদি “মুক্তিরও মন্দিরও সোপান তলে/ কত প্রান হল বলিদান” বাজিয়ে দিয়ে যায়, তাতে সত্যিই আপনার বিয়ে স্মরনীয় হয়ে থাকবে কি? আসলে শিল্প তখনই শ্রেষ্ট যখন তা প্রাসঙ্গিক।

এখন তো আমরা প্রাপ্তবয়স্ক, এখনকার পূজো অনেক পুরোন বন্ধুবান্ধবদের একসাথে মিলিত হওয়ার দিন। যারা জীবনের শৈশব, কৈশোর আর যৌবনের প্রথমার্ধ পেরিয়ে এখন কর্মসূত্রে বিচ্ছিন্ন ,চিন্তাশক্তি আর চিন্তাসূত্রও বিচ্ছিন্ন। পূজোর প্রথমার্ধ অর্থাৎ সপ্তমী-অষ্টমী কাটে এক বছরের ইতিহাস পর্যালোচনায় যাতে একগাদা নাম না জানা চরিত্রের পটচিত্র অঙ্কন করে শ্রুতিনাটকটা বোধগম্য করতে হয়। তার পরের অর্ধে ধীরে ধীরে বোধগম্য হয় যতই প্রবল আমাদের নস্টালজিয়া হোক না কেন আসলে আমরা ভিন্ন রঙের ভিন্ন স্বাদের আর ভিন্ন মতাদর্শের কতকগুলি ভিন্ন মুখ ছাড়া আর কিছুই নয়।নবমীর সন্ধ্যের হাস্পাতাল চত্ত্বরের প্রতিমা দর্শনকালে ফিরবার সময় হয়তো চোখে পড়ে বাবার মৃত্যুশয্যা পাশে কোনও কিশোরীর অশ্রুক্লিষ্ট নির্মল মুখখানি। মনটা কেন জানি না বড় উদাস (পঙ্কজ উদাস নয়) হয়ে যায়, কৈশোরের নির্মলতা, প্রথম প্রেমের যন্ত্রনা, উৎসবের নির্মমতা আর জীবনের সমস্ত ব্যার্থতার জ্বালাগুলো একসাথে বুকে করে নিয়ে গুটিসুটি মেরে ফিরে আসি সেই চেনা বিছানার কোলে।নিকটবর্তী কোনও পূজোমন্ডপ থেকে ভেসে আসে।

“দিল নাউম্মিদ তো নহী/ নাকাম হী তো হ্যা

লম্বী হ্যা গমকি শাম/ মগর ইয়ে শাম হী তো হ্যা”

One Response to “আসছে বছর আবার হবে”

  1. khub valo hoyeche.
    I am impressed.

Leave a Reply


− three = 4